...

Sunday, October 13, 2024

ভারতের চাণক্যনীতি ‘আনুপাতিক নির্বাচন’


 

গণহত্যা করে পলাতক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে হিন্দুত্ববাদী ভারত। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি যাতে অংশ নিতে পারে এবং আনুপাতিক ভোটের মাধ্যমে সংসদে আসন পেতে পারে সে ছক এঁকেই এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্প হচ্ছে ‘আনুপাতিক নির্বাচন’। আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ক্রম অধিকারসম্পন্ন প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। এরপর সারা দেশব্যাপী যে রাজনৈতিক দল যত শতাংশ ভোট পায়, সংসদে তত শতাংশ আসন পায়। এ লক্ষ্যে এদেশীয় ভারতীয় এজেন্ট সংগঠন, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে জনমত গড়ার চেষ্টায় নেমেছেন। তারা শেয়ালের মতো একই সুরে হুক্কাহুয়া দেয়া শুরু করেছে। সভা-সেমিনার এবং আওয়ামী লীগের তাবেদার গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনকে দিয়ে নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার করতে চাচ্ছে। এটা হলে তিনশ’ আসনের প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী সংসদে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব করতে আসন বণ্টন আইন করা হবে। জামায়াত ইতোমধ্যেই ভারতের এই আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন প্রকল্পের ফাঁদে পা দিয়েছে। দলটি মনে করে একটি কল্যাণ ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনুপাতিক হারে করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়ার মতো ভোট পান না এমন বাম দলের নেতারাও তিনশ’ আসনে প্রার্থী দিয়ে দু’একটি আসনের লোভে ভারতীয় ডিজাইনের নির্বাচন কমিশন সংস্কারের পক্ষে। অবশ্য ইসলামী ধারার দলগুলো তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। তবে বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী ধারার দলগুলো ভারতীয় নীল নকশা ধরে ফেলে ‘আনুপাতিক হারে সংসদে আসন বণ্টন’ কৌশলের বিরোধিতা করছে। বিএনপি মনে করে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনার দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে দিল্লি পালানোর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটেছে। সেই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতেই নির্বাচন ব্যবস্থায় এমন সংস্কার আনার বিষয় নিয়ে কথা উঠাচ্ছেন তাবেদাররা।


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, নির্বাচন কমিশনে যে সংস্কারই করা হোক না কেন, সবকিছু নির্ভর করে তা সত্যিকারভাবে বাস্তবায়ন করার ওপর। আর তা কার্যকর করবে রাজনৈতিক দল, যারা পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব।

সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কেমন চাই’ সেমিনারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অন্তর্বর্তী সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি প্রস্তাব করেন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সরাসরি ভোটে নারী আসনে নির্বাচন, প্রার্থীদের ব্যয় পর্যবেক্ষণে রাখার বিধান করা যেতে পারে।

সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিদ্যমান পদ্ধতি বাদ দিয়ে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি জরুরি বলে দাবি করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে দ্রæত যাবেন কি না, এ জন্য কী কী করবেন, তা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন করা সময়ের দাবি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বাস্তবতার নিরিখে যা সংস্কার করা দরকার, তাই করতে হবে। বিনা প্রতিদ্বিদ্বতায় ভোট হওয়া উচিত না। প্রয়োজনে সেখানে পুনরায় ভোট করতে হবে। শিক্ষকরা রাতের ভোটের সহযোগী ছিলেন। এক্ষেত্রে আমাদের স্কাউটদের গার্লস গাইডদের ব্যবহার করতে পারি। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে তিন বছরের বাধ্যবাধকতা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা উচিত। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ডা. মু. শফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী সংস্কারে ৯টি পয়েন্ট স¤প্রতি সংবাদ সম্মেলনে আমরা তুলে ধরেছি। সংসদে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন। জামায়াতের প্রস্তাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনুপাতিক বা সংখ্যানুপাতিক হারে করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেমিনারে প্রথম আলোর সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, তত্তাবধায়ক সরকার রাখা জরুরি। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিদ্যমান পদ্ধতিতে নির্বাচন নাকি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোট হবে, সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, আমি মনে করি সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় করতে হবে। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা করতে হবে। দল নিবন্ধন প্রথা সঠিক। তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির বিষয়টি নির্বাচন কমিশনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এখতিয়ার নয়। এটি সংবিধানের বিষয়। সংবিধান সংস্কার কমিশন যদি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তাঁদের কমিশন কিছু প্রস্তাব দেবে।

প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত দার্শনিক চাণক্য। চাণক্য নীতি অনুসরণ করেই ভারত লেন্দুপ দর্জিকে হাত করে ভোটের মাধ্যমেই সিকিমকে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। বাংলাদেশেও সেই নীতি গ্রহণ করে দিল্লি গণহত্যাকারী হাসিনার পক্ষ নিয়েছে। আওয়ামী লীগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নানা কৌশল করছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তাদের বক্তব্য ভারত নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপদে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে এখন পর্দার আড়াল থেকে হাসিনাকে আগামী নির্বাচনে পুনর্বাসনের নামে দেশীয় এজেন্টদের দিয়ে ‘আনুপাতিক নির্বাচন’ দাবি উঠাচ্ছে। এই অপচেষ্টাতেও সফল হবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৯ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনসহ ৬টি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। অতঃপর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করেন। কমিশন ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। কিন্তু নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারকে দিয়ে ভারতের নীল নকশা অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে সংসদ নির্বাচনে ‘ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি’ পদ্ধতি আইন করানোর চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ অনুগত কিছু গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ ছাপা শুরু হয়ে গেছে। সভা-সেমিনারও করা হচ্ছে। হাসিনা পালানোর বাস্তবতা ভারত কল্পনাও করেনি। দিল্লিতে আশ্রয় দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সে দেশে তাকে আশ্রয় দেবে না জানিয়ে দিয়েছে। আরো কয়েকটি দেশ তাকে জায়গা দেবে না বলে জানিয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র দিল্লির কাছে জানতে চেয়েছে তারা শেখ হাসিনাকে কিভাবে রেখেছেন, কারণ তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল হয়েছে এবং ভারতে বিনা ভিসায় ৪৫ দিন থাকার মেয়াদ উতরে গেছে। এ অবস্থায় ভারত হাসিনাকে টুরিস্টভিসা দিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই বাংলাদেশ সরকার হাসিনাকে ফেরত চাইবে। এ অবস্থায় ভারত চায় যে কোনো প্রক্রিয়ায় হোক হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এ জন্যই হঠাৎ করে সংখ্যানুপাতিক হারে আসন ব্যবস্থার নির্বাচন পদ্ধতি ইস্যু তুলে ধরা হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment

অন্যদের প্রতি নেতিবাচক আচরণ থেকে বিরত থাকতে কিছু অভ্যাস,

  অন্যদের প্রতি নেতিবাচক আচরণ থেকে বিরত থাকতে কিছু অভ্যাস, মনোভাব ও কৌশল চর্চা করা যেতে পারে। নিচে ধাপে ধাপে বলছি— 🌱 ১. নিজেকে সচেতন করুন...